Reading Time: 4 minutes

শুরু করি আলো দিয়েঃ

দৃশ্যমান আলো আসলে তাড়িতচৌম্বকীয় তরঙ্গের একটা ক্ষুদ্র অংশ (৩৮০-৭০০ ন্যানোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্য)। এই তাড়িতচৌম্বক তরঙ্গগুলোকে ছোট ছোট ক্ষুদ্রতম অংশে ভাগ করা যায়, যে অংশগুলোর একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ শক্তি থাকবে। এই নির্দিষ্ট শক্তির প্যাকেটগুলোকে ফোটন বলে। ফোটনের কারণেই মনে হয় আলো কণা হিসেবে আচরণ করছে। সত্যিকার অর্থে আলো রশ্মি এবং কণা দুটোই, খালি প্রেক্ষাপট ভিন্ন।

এবার আসি পরমাণুতেঃ

সহজভাবে বলতে গেলে, পরমাণুর ভিতরে অনেক ভারী এবং ছোট একটি নিউক্লিয়াস থাকে। এই নিউক্লিয়াস প্রোটন নামে ধণাত্মক কণা আর নিউট্রন নামে চার্জবিহীন কণা দিয়ে গঠিত। নিউক্লিয়াসের বাইরে ঋণাত্মক চার্জযুক্ত ইলেকট্রন কতগুলো নির্দিষ্ট শক্তিস্তরে ঘুরতে থাকে। প্রোটন, নিউট্রন আর ইলেকট্রনের মধ্যে প্রোটন আর নিউট্রনের ভর প্রায় সমান, আর ইলেকট্রন সবচেয়ে হালকা (প্রোটনের ভরের ১৮৪০ ভাগের ১ ভাগ)।

বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের থেকে প্রশ্ন আসতে পারে, “এসব তো আমরা জানি! এর সাথে স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সম্পর্ক কোথায়?”

এবার আসি আসল প্রসঙ্গেঃ

ফোটনের ক্ষেত্রে খেয়াল কর, ফোটন কণা হওয়া সত্ত্বেও এর কোন ভর নেই (আছে শুধু নির্ধারিত পরিমাণ শক্তি)। আর প্রোটন, নিউট্রন আর ইলেকট্রনের কিন্তু ভর আছে। বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, এগুলোকে একটু সাজিয়ে লেখা যায় না? এই সাজানোর প্রচেষ্টাই স্ট্যান্ডার্ড মডেলে ধরা পড়েছে।

তো বিজ্ঞানীরা সাজাতে গিয়ে দেখলেন যে প্রোটন আর নিউট্রন আবার তিনটি করে ক্ষুদ্র কণা দিয়ে তৈরি। তিনটি কণার মধ্যে দুটি আবার এক রকমের। বিজ্ঞানীরা চাইলেন প্রোটনের চার্জ +1 রাখতে। এতে হলো কী, সেই ক্ষুদ্র কণা তিনটির চার্জ ভগ্নাংশ হয়ে গেল!

এখন এই কণাগুলোর তো নাম দেয়া দরকার। বিজ্ঞানীরা নাম রাখলেন কোয়ার্ক। কোয়ার্ক মূলত দুধরণের পাওয়া গেলঃ আপ আর ডাউন কোয়ার্ক। প্রোটনের দুটো আপ কোয়ার্ক, একটা ডাউন কোয়ার্ক। নিউট্রনের দুটো ডাউন কোয়ার্ক, একটা আপ কোয়ার্ক। আপ কোয়ার্কের চার্জ ২/৩, ডাউন কোয়ার্কের চার্জ -১/৩।

কোয়ার্কেরও ইলেকট্রনের মতো  স্পিন আছে। ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘুরলে লেফট হ্যান্ডেড (বাঁহাতি) কোয়ার্ক, বিপরীত দিকে ঘুরলে রাইট হ্যান্ডেড (ডানহাতি) কোয়ার্ক।

ইলেকট্রন আর নিউট্রিনো?

এরাও ভরযুক্ত (নিউট্রিনোর সামান্য হলেও ভর আছে), তবে এরা কোয়ার্ক দিয়ে গঠিত নয়। তাই এদের একসাথে নাম দেয়া হয়েছে লেপ্টন। একটা বিষয় উল্লেখযোগ্যঃ ইলেকট্রনের ডানহাতি এবং বাঁহাতি স্পিন থাকলেও নিউট্রিনোর কোনো ডানহাতি স্পিন আজ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি।

কোয়ার্ক আর লেপ্টনকে একসাথে ফার্মিওন বা ম্যাটার পার্টিকেল বলা হয়।

মনে রাখতে হবে, ফার্মিওনের প্রতিটি কণার বিপরীত চার্জযুক্ত কণা আছে, যেগুলোকে প্রতিকণা বা অ্যান্টিম্যাটার বলা হয়। স্ট্যান্ডার্ড মডেলে সরলতার জন্য শুধু কণাগুলোকে ধরা হয়েছে।

কণার কি আর শেষ নেই?

প্রকৃতি কোনো এক অজ্ঞাত কারণে কোয়ার্কের আর লেপ্টনের আরও দুজোড়া করে কণা তৈরি করেছে, তবে এরা ভারী, আর অস্থায়ী। ছোট একটা টেবিলে এদের নাম দেয়া যাকঃ

কনার নামআগেরর কনার চেয়ে ভারি কণাআগের কনার চেয়ে আরও ভারী কণা
আপ কোয়ার্ক চার্ম কোয়ার্ক টপ কোয়ার্ক
ডাউন কোয়ার্ক স্ট্রেঞ্জ কোয়ার্ক বটম কোয়ার্ক
ইলেক্ট্রনমিউওনটাউ
নিউট্রিনো মিউওন নিউট্রিনো টাউ নিউট্রিনো

স্ট্যান্ডার্ড মডেলের একটা বড় ঘাটতি হলো যে মহাকর্ষ আর ডার্ক ম্যাটার সংক্রান্ত কোনো কণার কোনো বর্ণনা নেই। কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড মডেলের একটা বড় সফলতা হলো বল আর কণার মিথস্ক্রিয়া স্পষ্টভাবে তুলে ধরা। সেটাতেই এখন মনোযোগ দেয়া যাক।

বোসন কণাঃ

এখনও কণা নিয়েই কথা বলে যাচ্ছি! কিন্তু কণার মিথস্ক্রিয়াতেই উৎপন্ন হয় বল (নিউটনিয়ান বলের সংজ্ঞা নিশ্চয়ই এখানে প্রযোজ্য নয়)। কাজেই বারবার ফিরে আসা।

শুরু করি আমাদের ভরবিহীন ফোটন দিয়ে, তাড়িতচৌম্বক বলের প্রতিনিধিত্বকারী কণা। এটা গেজ বোসন নামে কণাগুচ্ছের অন্তর্ভুক্ত। সবল আর দুর্বল নিউক্লীয় বলের ক্ষেত্রে কী হবে?

কোয়ার্কের বর্ণনা দেয়ার সময় একটা জিনিস আমি ইচ্ছা করে এড়িয়ে গিয়েছি। আপ আর ডাউন কোয়ার্কের আবার তিনটা করে কালার ফ্লেভার আছেঃ লাল, নীল, সবুজ। সহজ করে বলতে গেলে এদের চার্জের ভিন্নতা নেই, না আছে এদের সত্যিকার কোনো রঙ। শুধু কিছু ধর্মের ভিন্নতা বোঝানোর জন্য নাম দেয়া হয়েছে “কালার”।

কোয়ার্ক Gluon নামে কণার মাধ্যমে ফ্লেভার বদলাতে পারে। লাভ কী? সবল নিউক্লীয় বল তিনটা করে ভিন্ন কালারের (প্রত্যেকটা ভিন্ন ভিন্ন ফ্লেভারের হতে হবে) কোয়ার্ক জোড়া লাগিয়ে রাখতে পারে। (একটা প্রোটন আর নিউট্রনে আলাদা কালারের কোয়ার্ক থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই। তার মানে সবল নিউক্লীয় বলের জোড়া লাগানো তিন ফ্লেভারের কোয়ার্কের একটা প্রোটনের মধ্যে, বাকি দুটো নিউট্রনের মধ্যে থাকতে পারে!)  এভাবে নিউক্লিয়াসে প্রোটন আর নিউট্রন একসাথে থাকতে পারে, যদিও প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী এদের ছিটকে দূরে সরে যাওয়ার কথা। চিন্তা করো, সবল নিউক্লীয় বলের প্রভাব কত বেশি!

এবার একটু বাঁহাতি কোয়ার্কের দিকে মনোযোগ দেয়া যাক। বাঁহাতি আপ কোয়ার্ক দুটো বিশেষ বোসন কণার জন্য দুর্বল মিথস্ক্রিয়ায় বাঁহাতি ডাউন কোয়ার্কে রূপান্তরিত হয়। এই কণাগুলো হলো ডাব্লিউ আর জেড বোসন। প্রশ্ন আসতে পারে, ডানহাতি কোয়ার্কে এরকম কিছু হয়না? উত্তরটা হলো, হয়তো, কিন্তু এরকম কিছু এখন পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়নি!

এতো গেলো গেজ বোসন, আর কোনও ধরণের বোসন আছে নাকি?

জানো কি, বোসন নামটা যে আমাদের দেশের বিজ্ঞানী সত্যেন বসুর নাম থেকে এসেছে? পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর অবদানের জন্য এমনটা করা হয়েছে। পিটার হিগস নামে আরেকজন বিজ্ঞানী কণার ভর থাকার পেছনের কারণ নিয়ে গবেষণা করায় তাঁর নামেও স্ট্যান্ডার্ড মডেলে কণার নামকরণ করা হয়েছে।

হিগস-বোসন নামটা চেনা চেনা লাগছে না? এটাই আমাদের বহু প্রতীক্ষিত স্ট্যান্ডার্ড মডেলের সর্বশেষ কণা। এবং ঠিকই ধরেছ, এই কণাই ফার্মিওনের ভরযুক্ত হওয়ার কারণ।

খুবই সহজ করে বলতে গেলে, মহাবিশ্ব হিগস ফিল্ডের মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছে। এই ফিল্ডের ক্ষুদ্রতম শক্তিগুচ্ছের ইউনিট হিগস কণার সাথে ফার্মিওনের মিথস্ক্রিয়া হয়ে কণাগুলো বাধাপ্রাপ্ত হয়। এই বাধাকে ভর হিসেবে ধরা হয়। অবশ্যই, গেজ বোসন হিগস বোসনে বাধাপ্রাপ্ত হয় না্, তাই এদের কোন জানা ভর নেই।

স্ট্যান্ডার্ড মডেলের কণাসমূহ নিয়ে একটা ছবি নিচে দেয়া হলোঃ

স্ট্যান্ডার্ড মডেল

শেষ কথাঃ

যেমনটা দেখলে, স্ট্যান্ডার্ড মডেলে ডানহাতি কোয়ার্কের মিথস্ক্রিয়া, ডার্ক ম্যাটার, মহাকর্ষ নিয়ে কোনো কথা নেই। তাই কোনোভাবেই এটা মহাবিশ্বের সব ইন্টারঅ্যাকশনের সংক্ষিপ্ত রূপ না, যদিও এর শুরুটা এই উদ্দেশ্য নিয়েই হয়। তারপরও স্ট্যান্ডার্ড মডেল যা অর্জন করেছে তা নেহাত কম নয়। আর এই অসম্পূর্ণতাই পরবর্তী বিজ্ঞানীদের গবেষণা করে যেতে অনুপ্রেরণা জোগায়। এতটুকু যে জেনেছি, এই বা কম কী! নিজেকে অভিনন্দন জানাও, এত বছরের গবেষণায় পাওয়া ফলাফল ৫ মিনিটের মধ্যে পড়ে ফেলার জন্য।

Source:

Factmyth.com

Quanta magazine

বিজ্ঞানচিন্তা ম্যাগাজিন CERN

Get more articles Like this Here

Can check out this also