Reading Time: 4 minutes

নিউট্রিনো সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করায় বর্তমানকালে মহাকাশ বিজ্ঞানের অনেক অগ্রগতি করা সম্ভব হচ্ছে। তাই আজ একসাথে নিউট্রিনো সম্পর্কে বিস্তারিত সকল তথ্য জেনে নিই।

নিউট্রিনোতে দু ধরণের বল ক্রিয়া করে থাকে, দূর্বল নিউক্লিয় বল (Weak interaction) এবং মাধ্যাকর্ষণ (Gravity)। তড়িৎ নিরপেক্ষ (neutral) হওয়ায় এবং অতি ক্ষুদ্র ‘স্থির ভর’ সম্পন্ন হওয়ার কারণে (-ino) একে নিউট্রিনো বলা হয়। এই কণার ‘স্থির ভর’ এতই কম যে, আগে যখন সুক্ষ্ম যন্ত্র দিয়ে পরীক্ষামূলক ফলাফল পাওয়ার আভিজাত্য ছিল না মানবজাতির, তখন নিউট্রিনোর ‘স্থির ভর’ শুন্য ধরা হয়েছিল। নিউট্রিনো ভরেরর দিক থেকে অন্য প্রায় সব কণ্রার নিচে আটকে আছে।

নিউট্রিনো কোথা থেকে পাওয়া যায়? আপনার গা দিয়ে কিছুক্ষণ আগেই অনেক গুলো চলে গেছে, আপনি টেরও পাননি। সূর্যের (ও আকাশের অসংখ্য তারার) অনবরত ফিউশন বিক্রিয়ায়ও অনেক পরিমানে নিউট্রিনো উন্মুক্ত হয় মহাবিশ্বে। নিউট্রিনোর উৎস ‘রেডিওএকটিভ ডিকে” যা নিউক্লিয়ার বোমা, নিউক্লিয়ার রিয়েক্টর, পার্টিকেল এক্সেলারেটর, সুপারনোভা, নিউট্রন শ্তারের স্পিন ডাউনের সময়, কসমিক রশ্মির সাথে পদার্থের সংঘর্ষ এবং এরকম আরো অনেক ঘটনা থেকে সৃষ্টি হয়। তারা মৃত্যুর সময় প্রচুর পরিমাণ নিউট্রিনো একসাথে নির্গত হয়। তারার বিস্ফোরণ তার পৃষ্ঠে পৌছানোর আগেই নিউট্রিনো মুক্ত ‘পাশের বাসার আন্টি’ কিংবা ‘বস্ত্রফতুর ফেমিনিস্ট’ এর মতো মহাবিশ্বে বিচরণ করা শুরু করে দেয়। “আমাদেরকে সমাজ থেকে প্রত্যাখ্যান করা হলো কেন?” “ওর ক্যারিয়ার দেখে আসলাম এক চুটকিতে ধ্বংস (করা) হয়ে গেল” – এই বার্তা পৌছে দেবার জন্য তারা মহাবিশ্বের পৌছানো যায় এমন সকল জায়গায় গিয়ে সেই তারার “মৃত্যু” র খবর দিইয়ে আসে, সেই খবর পেয়ে আপনি আমি পপকর্ণ নিয়ে লাইভ প্রিমিয়ার সুপারনোভা দেখতে বসি।

সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিউট্রিনো খোঁজার পদ্ধতি। নিউট্রিনোর ভর অতি ক্ষুদ্র, ‘স্থির ভর’ আরো কম, তড়িৎ ক্রিয়ায় সাড়া দেয় না, একমাত্র দূর্বল নিউক্লিয় বল এর সদব্যবহার করেই নিউট্রিনোর ডিটেক্টর তৈরি করা হয়। নিউট্রিনো ডিটেক্ট করার যন্ত্রও আকারে তাই বড় হতে হবে, যাতে বেশী জায়গা জুড়ে নিউট্রিনো গ্রহণ করতে পারে। তাছাড়া cosmic ray এবং অন্য যেকোনো ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশন থেকে পৃথক রাখতে এসব ডিটেক্টর মাটির নিচে স্থাপন করা হয়। বড় বড় ডিটক্টরের হলেও এদের জন্য দামি স্যাটেলাইট ডিশ লাগে না, লাগে পানি। হ্যাঁ, পানি! কিভাবে? জাপানের Super Kamiokande নিউট্রিনো অবজার্ভেটরিতে ফটোটিউব এ ঘেরা বড় একটি জলাশয়ে Chernekov Radiation এর উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই রেডিয়েশন তখনই সৃষ্টি হয় যখন নিউট্রিনো পানিতে একটি ইলেকট্রন বা নিউয়ন তৈরি করে। কানাডার Sudbury Neutrino Observatory তে প্রায় একই ব্যবস্থা, কিন্তু হেভি ওয়াটার ব্যবহার করা হয়। অন্য অনেক ডিটেক্টরে বিশাল আয়তনের ক্লোরিন অথবা গ্যালিয়াম ব্যবহার করা হয়, যা ব্যবহার করা কষ্টকর। এগুলোতে মাঝে মাঝেই আর্গন বা জার্মেনিয়ামের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়, যারা আসলে নিউট্রিনোর সাথে ক্লোরিন ও গ্যালিয়াম পরমানুগুলোর বিক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়।

Science এর জুলাই ১৯৫৬ ইস্যু তে ৫ জন সম্মিলিতভাবে নিউট্রিনো (টেকনিক্যালি ইলেকট্রন এন্টিনিউট্রিনো) খুঁজে পাওয়ার খবর প্রকাশ করেন, যার ফল 1995 Nobel Prize, প্রায় ৪০ বছরের ব্যবধানে। এই এক্সপেরিমেন্টে একটি নিউক্লিয়ার রিয়েক্টরে inverse beta decay এর মাধ্যমে এন্টিনিউট্রিনো উৎপন্ন করা হয়। সেই এন্টি নিউট্রিনোর সাথে প্রোটন এ বিক্রিয়া করিয়ে নিউট্রন ও পজিট্রন তৈরি করা হয়। যদিও এই বিক্রিয়া ঘটার সম্ভাবনা নগন্য ছিল রিয়েক্টরে, বিক্রিয়ার উৎপাদ অনন্য হওয়ার কারণে কণার অস্তিত্ব প্রমাণে কোনো সমস্যা হয়নি। পজিট্রন উপস্থিত ইলেক্ট্রনের সাথে মিলিত হয়ে বিলপ্ত হয়ে যায় , যার ফলে দুটি গামা রশ্মি নির্গত হয়। নিউট্রনগুলো গ্রাহক নিউক্লিয়াস দিয়ে শোষণ করা হলে তৃতীয় একটি গামা রশ্মি নির্গত হয়। এত গামা রশ্মি গুলো যন্ত্রের সাহায্যে ডিটেক্ট করেই নিউট্রিনোর বিক্রিয়ার ক্ষুদ্র কিন্তু অনন্য সিগনেচার পাওয়া  যায়। পানির হাইড্রোজেন পরমাণুর সাথে অক্সিজেন পরমাণুর বন্ধন তত বেশী শক্তিশালী না, তাই পানিতে থাকা হাইড্রোজেনর প্রোটনই এন্টিনিউট্রিনোর জন্য টার্গেট হিসেবে যথোপযুক্ত। অধিক ও ভারি পরমাণুর প্রোটন বিবেচনায় আনলে এ বিক্রিয়ার জন্য জটিল হয়ে পড়বে, 

কারণ উক্ত প্রোটনগুলোর নিউক্লিয় বন্ধন শক্তিশালী।

      চিত্রঃ নিউট্রিনোর সাথে প্রোটনের বিক্রিয়ায় নিউট্রন ও পজিট্রন তৈরি     নিউট্রিনো একধরণের ফার্মিয়ন ও লেপ্টন কণা, স্ট্যান্ডার্ড মডেলে এর স্বীকৃতি আছে। নিউট্রিনোর স্পিন ১/২। নিউট্রনের দুর্বল নিউক্লিয় বলের পাল্লাও অনেক ছোট। দূর্বল নিউক্লিয় বএল্র কারণে নিউট্রিনোর তিনটি ‘ফ্লেভার’ (লেপ্টোনিক ফ্লেভার) আছে। ভ্যানিকা, স্ট্রবেরি আর চকোলেট এর মতো ইলেকট্রন নিউট্রিনো, মিউয়ন নিউট্রিনো আর টাউ নিউট্রিনো আছে। অন্যান্য চার্জিত লেপ্টোনের সাথে এর সম্পর্ক আছে। নিউট্রিনোর তিনটি ভিন্ন ভিন্ন ও ক্ষুদ্র ‘বিচ্ছিন্ন ভর’ খুঁজে পাওয়া গেছে, যদিও তাদের কোনোটি একটি ফ্লেভারের জন্য নির্দিষ্ট না। কোনো একটি ফ্লেভারের জন্য নিউট্রিনো কণায় উক্ত তিন ভরের নির্দিষ্ট কোয়ান্টাম সুপারপজিশন  পরীক্ষিত হয়েছে। এই সুপারপজিশোনের কারনেই গতিশীল অবস্থায় এই কণার ফ্লেভার পরিবর্তন করা, বা বিজ্ঞানীদের ভাষায় Oscillate(বাংলায় আক্ষরিক অর্থে স্পন্দিত হওয়া, দিক পরিবর্তিত হওয়া) করা বলে, যেমনঃ অনেক দূরে অবস্থিত কোনো উৎস থেকে ইলেকট্রন নিউট্রিনো উৎপন্ন করা হলে তা এই প্রান্তে স্থাপিত ডিটেক্টরে টাউ বা মিউয়ন নিউট্রিনো হিসেবে ধরা পড়ার সম্ভাবনা থাকে (যা অতি ক্ষুদ্র একটি সম্ভাবনা, তবে অশূন্য)। নিউট্রিনো অসিলেশন নিউট্রিনো এস্ট্রোনমিতে অনেক বিরাট একটি বিষয়, যার জ্ঞান এস্ট্রনমির অনেক বড় একটি সমস্যার সমাধান করায় ভূমিকা রেখেছে। মহাকাশবিজ্ঞানীরা ‘ধারণা’ দিয়েছেন যে উক্ত তিন ভরের যোগফল একটি ইলেক্ট্রনের ভরের ১০ লক্ষ ভাগের এক ভাগের সমান হতে পারে (প্রায়), এখনো বের করা যায়নি তিনটি ধ্রুবক কি কি। নিউট্রিনোর কাইরালিটি বাম হাতি ‘ধরা হয়’, বাম হাতি কেন? কারণ কোনো এক হাত ধরা লাগবে তাই, অনেকে এই বোকা প্রশ্ন করে, আর আপনারা তাদেরকে এধরণের সকল ‘কনভেনশন’ বিষয়ক প্রশ্নের পরিষ্কার জবাব দিয়ে দিবেন আমাদের তরফ থেকে। এন্টিনিউট্রিনোর স্পিন, চার্জ সব নিউট্রিনোর সমান, কিন্তু লেপ্টন নম্বর উলটো (সামনে একটা ঋণাত্মক চিহ্ন) এবং এর কাইরালিটিও ডান হাতি, বা সহজ কথায়, নিউট্রিনোর উলটো। যেহেতু নিউট্রিনো বাম হাতি ‘ধরেছে’ বিজ্ঞানীরা, তাই এন্টিনিউট্রিনোতে উলটো দিয়েছে। “নিউট্রিনোর বাম গালে তিল ছিলো তাই দিয়েছি” – এরকম কোনো কারণ নেই। বাম হাতি ডানহাতি নির্দিষ্ট ভাবে দেওয়াটা এখানে Redundant বা পার্থক্য সৃষ্টি করেনা, যেমনটা পাশের বাড়ির আন্টির প্রশংসা অথবা সমালোচনায় দুনিয়ার কিছুই চলে না (তোমার হার্টবিট ছাড়া)।