Reading Time: 3 minutes

রেলস্টেশনে তুমি ও তোমার বন্ধুঃ

খুবই সহজ একটা উদাহরণ দিয়ে শুরু করা যাক। ধরো, তুমি একটি রেলস্টেশনের পাশে দাঁড়িয়ে আছ। আর ট্রেনের ভিতরে তোমার বন্ধু একটি বল হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে। ট্রেন স্থির অবস্থায় সে বলটা একবার বাউন্স করালো, আর বাউন্সের সময় স্টপওয়াচে গুনলো। তোমার হাতেও একই ধরণের আরেকটি স্টপওয়াচ আছে। তুমিও তোমার বন্ধুর সাথে সাথে সময় গুনলে। সময় একই আসছে, তাই না?

এবার ট্রেনটা চলতে শুরু করলো। আবারও তোমার বন্ধু বলটা বাউন্স করালো, আবারও তোমরা একসাথে সময় গুনলে। এবারও সময় প্রায় একই আসছে, তবে তোমার ঘড়িতে সামান্য বেশি (খুবই সূক্ষ্ম, তবে পার্থক্য আছে)। এবং মজার ব্যাপারটা হলো যে তোমার বন্ধুর ট্রেনের বেগ যত বেশি হবে, তোমাদের সময়ের পার্থক্যও তত বাড়তে থাকবে (মানে তোমার ঘড়িতে সময় আরও বেশি দেখাতে থাকবে)!

কী হলো???

আপেক্ষিক বেগঃ

প্রথমত, এটা স্পষ্ট যে তোমার আর তোমার বন্ধুর মাঝে আপেক্ষিক বেগ কাজ করছে (অর্থাৎ তোমার বন্ধু তোমার সাপেক্ষে একদিকে গতিশীল, তুমিও তোমার বন্ধুর সাপেক্ষে তার উল্টোদিকে গতিশীল)। বিজ্ঞানী গ্যালিলিও  আপেক্ষিক বেগ বিভিন্ন প্রসঙ্গ কাঠামোতে বের করার সূত্রও দিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে একটা শর্ত ছিল, দুটো প্রসঙ্গ কাঠামোতে একই ঘটনা ঘটতে একই সময় ধরে নিতে হবে।

এখানে তো একই ঘটনা ঘটতে ভিন্ন সময় লেগে যাচ্ছে! তাহলে তো মুশকিল!

গ্যালিলিয়ান ট্রান্সফরমেশন থেকে লরেঞ্জ ট্রান্সফরমেশনঃ

এবার বিজ্ঞানী লরেঞ্জ এগিয়ে এলেন। তিনি বললেন যে, দুটো ঘটনায় সময় আসলেই ভিন্ন, কারণ কাল দীর্ঘায়িত হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী সময় অনির্ভরশীল না। সবাই মাথা চুলকাতে লাগলো, নতুন করে আবার অংক কষতে বসতে হবে যে! পরে দেখা গেল যে আসলে বিষয়টা তেমন কঠিন না, আর গ্যালিলিওর ফর্মুলায় সামান্য কিছু পরিবর্তন আনলেই ঝামেলা চুকে যায়। কিন্তু এত দূর যাওয়ার আগে কাল দীর্ঘায়নকে সহজ করা যাক।

টাইম ডিলেশন

সহজভাবে দেখা যাকঃ

যখন তোমরা দুজনই স্থির, তখন বল বাউন্স করছে একই পথ অনুসরণ করে (উপর-নিচ)। অভিকর্ষকে গোনায় ধরে দুজনই একই সময় পাবে। যখন ট্রেনটা চলতে শুরু করে, তোমার বন্ধু ট্রেনের সাপেক্ষে স্থিরই থাকবে। সে বলটা বাউন্স করলে আগের মতোই চলার পথ থাকবে। তাই তার স্টপওয়াচে সময় আগের মতোই থাকবে।

তবে ট্রেন চলতে শুরু করার পর তোমার চোখে কিন্তু বলের চলার পথ এক থাকছে না (উপরের ছবিতে ডানের পথটার মতো লাগবে)। তখন বলটা তোমার হিসাব মতে বেশি পথ অতিক্রম করবে। আর বেশি পথ অতিক্রম করতে বেশি সময় নিবে, এটাই তোমার স্টপওয়াচে দেখা যাবে। ট্রেনের বেগ যত বাড়তে থাকবে, তোমার মনে হবে বলটা তত লম্বা পথ অতিক্রম করছে, তাই তোমার ঘড়িতে সময় আরও বাড়তে থাকবে। এপর্যায়ে তোমার স্টপওয়াচ বেশি সময় নিচ্ছে, আর বন্ধুর ঘড়িতে সময় কম লাগছে। তখন তোমার বন্ধুর মনে হবে যে তার প্রসঙ্গ কাঠামোতে সময় ধীর হয়ে যাচ্ছে। মূলত এটাই টাইম ডিলেশন, বা কাল দীর্ঘায়ন।

প্রকৃত সময়ের প্রকৃত সংজ্ঞাঃ

সচরাচর গতিশীল কাঠামোর সময়টাই প্রকৃত সময় লিখে বোঝানো হয়, কারণ সময় কম লাগছে গতিশীল কাঠামোতেই। প্রশ্ন আসে, যদি দুটো কাঠামোই গতিশীল হয়? ধরো দুটি গতিশীল রকেট থেকে একটা করে বই নিচে ফেলে দেয়া হল। কোনক্ষেত্রে কোনটা প্রকৃত সময়?

প্রকৃত সময়ের প্রকৃত (!) সংজ্ঞা বলে, কোনো একটা ঘটনার শুরু ও শেষ কোনো প্রসঙ্গ কাঠামোয় একই জায়গায় হয়, তাহলে ওই প্রসঙ্গ কাঠানোর সময়ই হলো প্রকৃত সময়। তোমার আর তোমার বন্ধুর ক্ষেত্রে, বন্ধুর প্রসঙ্গ কাঠামোয় ট্রেন চলমান অবস্থায় বল বাউন্স করে একই জায়গায় আসে, তাই বন্ধুর প্রসঙ্গ কাঠামোতে প্রকৃত সময় পাওয়া যায়। চলমান রকেটের ক্ষেত্রেঃ রকেট ১ থেকে বই ফেলে দিলে রকেট ১ এর সাপেক্ষে সময় হবে প্রকৃত সময়, রকেট ২ এর সাপেক্ষে না। রকেট ২ থেকে বই ফেলে দিলে রকেট ২ এর সাপেক্ষে সময় হলো প্রকৃত সময়, কারণ রকেট ২ এর মধ্যেই একই জায়গায় বইটা পড়বে। রকেট ১ থেকে সময় প্রকৃত হবে না। এভাবে “একই জায়গায় ঘটনার শুরু আর শেষ” ধরে সহজেই প্রকৃত সময় সংক্রান্ত কনফিউশন দূর করা যায়।

এটাই কি শেষ?

আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, আমরা পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রীরা কিন্তু অংক করার সময় টাইম ডিলেশন আলাদাভাবে ধরি না। কারণ খেয়াল করে দেখ, তোমার কাঠামোয় বলের সময়ই কেবল বাড়েনি, চলার পথও বেড়ে গেছে মনে হবে। এখানে লেংথ কন্ট্র্যাকশন নামে আরেকটা ব্যাপার কাজ করছে, যেটা কাল দীর্ঘায়নেরই মতো। তবে এখানে প্রসঙ্গ কাঠামোর সাথে প্রকৃত দৈর্ঘ্য এর সংজ্ঞার কিছু জিনিস বোঝার আছে, যেটা একবারে লিখছি না ওভারলোড হয়ে যাবে বলে।

এটুকু বুঝে রাখ যে কাল দীর্ঘায়ন আর দৈর্ঘ্য সংকোচন দুটো একসাথে কাজ করে, তাই আমরা সব মিলে “লরেঞ্জ ট্রান্সফরমেশন” ব্যবহার করি, যেটা দুটোকেই গুনে হিসাব করে। পরদিন এসব আর “স্পেসটাইম ডায়াগ্রাম” নিয়ে লিখলে সহজেই ধারণাটা পেয়ে যাবে। মোদ্দাকথা হলো যে, টাইম ডিলেশন সবে শুরু!

আজকের মতো শেষ কথাঃ

দেখলে, কোনো জটিল ফর্মুলা আর ধোঁয়াশা ছাড়াই কত সহজে বোঝা গেল টাইম ডিলেশন? আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে বেশিরভাগ ব্যাপারই শুরুতে অনেক ধাঁধাঁলো আর বোঝার ক্ষমতার বাইরে মনে হয়। একটু চিন্তার প্রেক্ষাপট বদলালেই সবকিছু অনেক সহজ হয়ে যায়, পুরোপুরি বোধগম্য না হলেও। এটাই বিজ্ঞানের সৌন্দর্য, এমনভাবে চিন্তা করানো যেভাবে চিন্তা করা সবার চিন্তার বাইরে!

Source: 1. University Physics with Modern Physics by Sears and Zemansky

   2. www.physics.stackexchange.com    3. থিওরি অফ রিলেটিভিটিঃ মুহম্মদ জাফর ইকবাল

Get more articles Like this Here

Can check out this also