Reading Time: 4 minutes

সেই প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ রহস্যের সন্ধানে ছিলো ত্রাসী। নিজ গণ্ডি পেরিয়ে মানুষ মহাবিশ্বের রহস্য সন্ধানে ছিল উন্মত্ত।  (উনবিংশ মূলত বিংশ শতাব্দীর ছিল বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের যুগ)। মহাবিশ্বের সৃষ্টি তত্ত্ব  নিয়ে দীর্ঘকালের এক সন্ধানের ফল।  ওঠে আসে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে। ১৯২৭ সালে প্রসারণশীল মহাবিশ্বের সৃষ্টি তত্ত্ব নিয়ে সবচাইতে নির্ভরযোগ্য তত্ত  বিগব্যাং বা  মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব প্রস্তাব করা হয়। যদিও বর্তমান কাল পর্যন্ত মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব ছাড়াও মহাবিশ্বের সৃষ্টি তত্ত্ব সম্পর্কিত আরো অনেকগুলি তত্ত্ব আবিষ্কৃত হয়েছে তবে মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব বা বিগ ব্যাং তত্ত্ব বিজ্ঞানীদের নিকট বর্তমান সময় পর্যন্ত সবচাইতে বেশি গ্রহণযোগ্য। মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বের মূল সারাংশ হচ্ছে মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয় একটি নির্দিষ্ট বিন্দুকণা(singularity) থেকে  যা ছিল অসীম ঘনত্ব সম্পন্ন যেখানেই মহাবিশ্বের সমস্ত পুঞ্জিভূত ছিল  আর সেখান থেকেই ১৩.৮ বিলিয়ন বছরের প্ৰসাৰণশীলতার এক যাত্রার মধ্য দিয়ে  তৈরি হয় আজকের মহাবিশ্ব এতসব গ্রহ নক্ষত্র তারকারাজি ও আরো অনেক কিছু( সত্যিই অধ্যাবসায়ের এক অসাধারণ নমুনা!!!) |

নক্ষত্র

কিন্তু নক্ষত্রের জীবনচক্র নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমি মহাবিশ্বের সৃষ্টি তত্ত্ব কেন বলছি? আচ্ছাহ! এখন তবে আসল বিষয়ে যাওয়া যাক। জীবন চক্রের শেষ পর্যন্ত  যাওয়া গেলে এই উত্তর পাওয়া যাবে বলে আশা করছি। কৃষ্ণগহবর সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের জানতে হবে নক্ষত্রের জীবন চক্র সম্বন্ধে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে  নক্ষত্রের জন্ম তত্ত্বের শুরুটা হয়েছিল অসীম ঘনত্বের অসীম  ভরের  সিঙ্গুলারিটি  নামক একটি পয়েন্ট  থাকে আর এর শেষ হয় অসীম ভর ও অসীম ঘনত্ব সম্পন্ন সিঙ্গুলারিটি  পয়েন্টেই  তথা কৃষ্ণ গহবর সৃষ্টির মাধ্যমে।

 মহাবিস্ফোরণ তত্ত্ব মতে মহা বিস্ফোরণের পর বৃহৎ পরিমাণ বায়ু মূলত  যা ছিল মূলত হাইড্রোজেন গ্যাস  তারা নিজস্ব মহাকর্ষীয়   আকর্ষণের চাপে নিজের উপরে  চুপসে যেতে থাকে। আর এভাবেই জন্ম হয়  তারকাসমূহের। 

আকার ও জীবনকালের দিক থেকে বিবেচনা করলে নক্ষত্রসমূহকে আমরা তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করতে পারি– প্রথমটি হলো অতি বৃহৎ আকারের তারকা, যারা সাধারণত লাল বর্ণের হয়ে থাকে। মাঝারি আকারের তারকা  যাদের মূলত আমরা হলুদ বর্ণের দেখে থাকে আর ছোট আকারের তারকা  এরা সাধারণত কমলা লাল বর্ণের হয়ে থাকে।

তবে একটি মজার ও স্ববিরোধী ব্যাপার হল বড় তারকা গুলির মৃত্যু ঘটে সবার আগে, তারপর মাঝারি এবং সবশেষে ছোট তারকা করে মৃত্যু ঘটে। এবার কারণটা ব্যাখ্যা করা যাক, বড় তারকা গুলিকে নিজের ভারসাম্য রক্ষার্থে প্রচুর জ্বালানি তথা হাইড্রোজেন ব্যয় করতে হয়, তাই এদের হাইড্রোজেন তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে যায় এবং মৃত্যু ঘটে সবার আগে তারপর মাঝারি এবং সবশেষে মৃত্যু ঘটে ছোট তারকা গুলির। কেননা তাদের ভারসাম্য রক্ষার্থে সবচেয়ে কম জ্বালানি খরচ করতে হয়। আমাদের সূর্যের এখনও ৫০০ কোটি বছর চলার মতো জ্বালানি তথা হাইড্রোজেন রয়েছে।

কিন্তু বিজ্ঞানীদের মনে প্রশ্নের কি শেষ আছে তাই অনুসন্ধান চলতে লাগলো জ্বালানি শেষ হলে কি হতে পারে তা নিয়ে। যখন একটি তারকা’র জ্বালানি শেষ হয়ে যায় তখন তারকাটি ধীরে ধীরে শীতল হতে থাকে ফলে তা ধীরে ধীরে সংকচিত হতে থাকে। ১৯২৮ সালে আমাদের উপমহাদেশের একজন বিজ্ঞানী সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর প্রস্তাব করেন, একটি নক্ষত্রের ভর যদি সূর্যের ভরের চেয়ে ১.৫ গুণ বেশি হয় অর্থাৎ নক্ষত্রটির ভর যদি 1.5 সৌর ভরের চেয়ে বেশি হয় তবে জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার পর তারকাটি নিজেকে মহাকর্ষ বল থেকে রক্ষা করতে পারে না তখন তারকাটিকে  রক্ষা করে এক প্রকার বিকর্ষণ বল যা আন্তঃনিউট্রন ও আন্তঃপ্রোটন এর মধ্যে কার্যকর থাকে আর তখন একে বলা হয় নিউট্রন তারকা অর্থাৎ 1.5 সৌর ভরের চেয়ে বেশি ভরের নক্ষত্রের জ্বালানি  শেষ হয়ে যাবার পরে তা পরিণত হয় নিউট্রন তারকায়।  এখন প্রশ্ন হলো ১.৫ এর চেয়ে কম ঘরের নক্ষত্রের পরিণতি কী হবে? এই প্রশ্নের ব্যাখ্যাও নোবেল বিজয়ী এই বিজ্ঞানীই  দেন। 

1.4 সৌর ভরের চেয়ে কম জ্বালানি সম্পন্ন নক্ষত্রগুলো মহাকর্ষের প্রভাবে সংকুচিত হতে থাকে এবং শীতল হবার সময় এরা প্রচুর শক্তি নির্গত করে ফলে এসকল নক্ষত্রের ঔজ্বল্য বেড়ে যায়। এসকল নক্ষত্রকে নোভা নক্ষত্র বলা হয়ে থাকে। এদের ঔজ্বল্য অনেক বেশী হয়ে থাকে এবং এরা অত্যন্ত ভারী হয়ে থাকে। সকল শক্তি নির্গত হওয়ার পর এরা শেত বামনে পরিণত হয় এবং সারা জীবন  শেত বামন হিসেবেই থেকে যায়।

কোন নক্ষত্রের ভর যদি ৩ সৌর ভরের চেয়ে বেশি হয় তখন জ্বালানি শেষ হবার পর তারকাটির মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র স্থান কালে আলোক রশ্মির গতিপথের পরিবর্তন করে (কিন্তু কেন ??).  শেষ পর্যন্তু এরা সংকুচিত হতে হতে ক্রান্তিক ব্যাসার্ধ(ইটা বার কি!!) প্রাপ্ত হয়, এই ক্রান্তিক ব্যাসার্ধের বক্রতা(!!) এতটাই বেশি হয় যে এর মহাকর্ষীয়  থেকে কোনো কিছুই এমন কি আলোও বের হয়ে আসতে পারে না।

উপরের লেখাটুকু ভালোমতো বুঝতে হলে, আমাদের বুঝতে হবে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা। সাধারণ আপেক্ষিকতা বলে, যেকোনো ভর  সম্পন্ন বস্তু মহাকর্ষীয় ক্ষেত্র তথা স্থান-কালে একটি বক্রতার সৃষ্টি করে। যার ভর যত বেশি  সেই বস্তু মহাকর্ষ ক্ষেত্র তথা স্থান-কালকে ততবেশি বক্র করবে। জ্বালানি শেষ হবার পর এসকল নক্ষত্রের(৩ সৈর ভরের বেশি ) ভর এতটাই বেশি হয় যে এরা স্থান-কালকে এত বেশি বক্র করে যে তা একটি নির্দিষ্ট সীমাকে অতিক্রম করে যাকে ক্রান্তিক সীমা আর এই ব্যাসার্ধকে প্রান্তিক ব্যাসার্ধ বলা হচ্ছে। ক্রান্তিক ব্যাসার্ধ অতিক্রম করে গেলেই সেখান থেকে কোন কিছুই বের হয়ে আসতে পারে না, এমনকি স্বয়ং মহাবিশ্বের সবচেয়ে গতিশীল সত্তা আলোও নয়। 

কৃষ্ণগহবর  সমূহ আকারে খুবই ক্ষুদ্র হয়ে থাকে তবে এদের ভর ও ঘনত্ত অত্যন্ত বেশি হয়। কৃষ্ণ গহবরের আকার নির্ভর করে এর ঘূর্ণন হারের উপর। কৃষ্ণবিবরের ঘূর্ণন হার শূন্য হলে তা নিখুঁতভাবে গোলাকার হয়ে থাকে আর ঘূর্ণন হার যত বেশি হবে কৃষ্ণগহ্বরের স্ফীতিও তত বেশি হবে।   তবে কিন্তু  ব্ল্যাক হোল কিন্তু পুরোপুরি ব্ল্যাক নয় এমনটিই দাবি করেন কালের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং। ১৯৭৪ সালের বিজ্ঞানী স্টিফেন ডব্লিউ হকিং প্রমাণ করে কৃষ্ণগহবর সমূহ ঘটনা দিগন্তের কিনারা থেকে খুবই সামান্য পরিমাণে কণা বিকিরণ করে থাকে যা কে হকিং বিকিরণ বলা হয়ে থাকে। 

উপরে উল্লেখিত ঘটনা দিগন্ত এর মানে টা আবার  কি?? এটা হয়তো অনেক জিজ্ঞাসু মানুষের মনেই প্রশ্ন তুলেছে। উত্তরটা বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং তার লেখা বিখ্যাত বই Brief History of Time from Big Bang to Black Hole এ  একটি সুন্দর উদাহরণের মাধ্যমে বুঝিয়েছেন। ধরা যাক একজন মহাকাশচারী একটি নক্ষত্রের পৃষ্ঠে দাঁড়িয়ে আছে, সত্যি অভুতপুর্ব সাহসী!! ঠিক এগারোটার দিকে নক্ষত্রটি ক্রান্তিক ব্যাসার্ধ  অতিক্রম করে ক্ষুদ্রতর হয়ে যাবে। আপনাদের মনে আছে তো ক্রান্তিক ব্যাসার্ধ অতিক্রম করলেই কিন্তু তারকাটি কৃষ্ণবিবরের পরিণত হবে। ঠিক 11 টায় তারকাটি কৃষ্ণবিবরের পরিণত হবে। এখন ওই সাহসী মহাকাশচারীর সহকর্মীরা আবার মহাকাশযানে চড়ে নক্ষত্রটিকে প্রদক্ষিণ করছে। এখন দশটা বেজে দশ মিনিটে ওই সাহসী মহাকাশচারী  তার সহকর্মীদের কাছে একটি সংকেত পাঠালেন।10:20 আবারো সংকেত পাঠালেন। 10:20 এ পাঠানো সংকেত  মহাকাশযানের পৌঁছাতে সময় নেবে দশটা 10 মিনিটে পাঠানো সংকেতটি অপেক্ষা বেশি সময়।  এভাবে দশটা 40এ পাঠানো সংকেত 10:30 এ পাঠানো সংকেত অপেক্ষা বেশি সময় নেবে। 10টা 50 এ  পাঠানো সংকেতটি  হয়তো মহাকাশযানে পৌঁছাবে কিন্তু সময় নিবে কয়েক কোটি বছর আবার দশটা 59 মিনিটে পাঠানো সংকেতটি  মহাকাশে মহাকাশযানে হয়তো পৌঁছাবে কিন্তু তাতে হয়ত সময় লেগে যাবে কয়েকশত কোটি বছর।  আর  এগারোটায় পাঠানো সংকেতটি মহাকাশযানে পৌঁছাতে সময় নেবে……….. অনন্ত কাল।  অর্থাৎ ইভেন্ট হরাইজন বা ঘটনা দিগন্ত হল এমন এক বাউন্ডারি লাইন যা অতিক্রম করে গেলে কোন তথ্যই, কোনো  কণাই  এমনকি আলো আর বেরিয়ে আসতে পারবে না। 

এখানে আমি ব্ল্যাকহোলের অতি যৎসামান্য এবং ক্ষুদ্র একটি ব্যাখ্যা প্রদানের চেষ্টা করেছি। ব্ল্যাকহোল ও মহাবিশ্বের অনেক কিছুই আছে যা আমাদের ধারণার বাইরে। মহাবিশ্বে রহস্যের কোন পরিসমাপ্তি নেই আর জিজ্ঞাসারও পরিসমাপ্তি নেই। তাইতো জ্ঞান আহরণের  যাত্রা হোক আরো ব্যাপ্ত, মহিমান্বিত ও প্রসারিত।

Get more articles Like this Here

Can check out this also